৫৬ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২৯ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হয়েছিলেন সন্দেশখখালির
‘বাঘ’ শাহজাহান শেখ। তারপর থেকে চলেছে একের পর এক নাটক। সেদিনই আদালতে তাকে তোলা
হলে আদালত তাকে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই নির্দেশ মেনে
নিতে পারেনি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। শাহজাহান রাজ্য পুলিশের হেফাজতে থাকলে রেশন
দুর্নীতি মামলার অনেক তথ্য প্রমাণ নষ্ট হতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে
হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় ইডি। এরপরই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানমের
ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দেয় শাহজাহান মামলার তদন্ত করবে সিবিআই। যার বিরুদ্ধে শীর্ষ
আদালতে আবেদন করে রাজ্য সরকার।
গ্রেফতারের সময় থেকে আদালতে তোলা, রাজ্য পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ সবেতেই দেখা
গিয়েছিল সন্দেশখালির ‘বাঘ’ শাহজাহান শেখ আচরণ করছেন বাঘের মতো। যেনো পুলিশ তাকে নয়,
তিনিই গ্রেফতার করেছেন পুলিশকে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় থেকেই দেখা
গিয়েছিল নিজের মর্জি অনুযায়ী উত্তর দিচ্ছেন তিনি। কখনও ইচ্ছে না হলে জবাব দিচ্ছেন
না। বারবারই জেরায় জানিয়েছেন, ‘উপরওয়ালার নির্দেশ ছিল’।
এরপরই অনেক টালবাহানার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে সিআইডি শাহজাহানকে হস্তান্তর করে
সিবিআইয়ের হাতে। তারপরই দেখা যায় ‘বাঘ’ থেকে ‘বেড়াল’ হয়ে গিয়েছেন শাহজাহান। এক
রাতেই সমস্ত তেজ উধাও হয়েছে সন্দেশখালির দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার।
দিনে সাতেক আগেই মেডিক্যাল চেকআপের সময় সংবাদমাধ্যমকে দেখে আঙুল নেড়ে ঈশারা
করেছিলেন শাহজাহান শেখ। যার অর্থ ‘নির্দেশ’। তর্জনী নেড়ে শাহজাহান বুঝিয়ে দিয়েছিলেন
কোনো কথা বলবেন না তিনি। কিন্তু গত শুক্রবার দেখা গেলো উল্টো ছবি। এদিন
সংবাদমাধ্যমকে দেখে নিরাপত্তার ঘেরাটোপ এড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুললেন
শাহজাহান। এদিন মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য জোকার ইএসআই হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাচ্ছিল
সিবিআই। সেখানেই শাহজাহান যে কথা জানান তার অর্থ, তিনি সুবিচার আশা করছেন।
তবে ইডি, সিবিআই বা আইনের কাছে নয়। কিন্তু সন্দেশখালির বাঘের
গলা থেকে আগের তেজ উধাও ছিল। আশার চেয়ে নিরাশাই বেশি ছিল শাহজাহানের গলায়। এদিন
সংবাদমাধ্যমকে দেখে শাহজাহান বলেন, ‘সব মিথ্যে কথা। উপরওয়ালা
এর বিচার করবে’।
শুধু গলাতেই নয় বদলেছে শাহজাহানের পোশাকও। এর আগে গ্রেফতারের সময় ধোপদুরস্ত
পোশাকে দেখা গিয়েছিল এই বিতর্কিত নেতাকে। পুলিশি হেফাজতেও ছিল পোশাকের বাহার।
কিন্তু বৃহস্পতিবার নিজাম প্যালেসে শাহজাহানের সেই ঠাঁট বাট উধাও হয়েছে।
কুর্তা-পাজামার বদলে শাহজাহানের পরণে ছিল সাদা টি-শার্ট। শুধু তাই নয় রাজ্য পুলিশ
শাহজাহানকে হেফাজতে পাওয়ার পর যেভাবে তদন্ত করছিল তাতে অনেকটাই ঢিলে ভাব থাকলেও
তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে যেতেই দেখা গেল উল্টো ছবি। রাজ্য পুলিশের জেরায় যে
শাহজাহান মুখ প্রায় খুলছিলেনই না, সেই তিনিই সিবিআইয়ের হাতে যেতেই, জানিয়ে দিলেন ইডিকে ভয় পাওয়ার কথা। পাশাপাশি জানিয়েছেন, কেন ইডি তার বাড়িতে আসার সময় তিনি কেনো বাড়ি ফেরেননি।
সিবিআই সূত্রের খবর, জেরায় শাহজাহান জানিয়েছেন, তিনি
ইডিকে ভয় পেয়েছিলেন। ইডি অভিযানে গ্রেফতার হতে পারেন ভেবেই আর সন্দেশখালির বাড়িতে
যাননি তিনি। প্রসঙ্গত, গত ৫ জানুয়ারি ইডি শাহজাহানের
সন্দেশখালির সরবেড়িয়ার বাড়িতে হানা দিয়েছিল। সেই সময় তারা শাহজাহানের বাড়িতে ঢুকতে
পারেননি। এরপরই শাহজাহান অনুগামীদের হাতে আক্রান্ত হয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার
আধিকারিকরা। জেরায় শাহজাহান জানিয়েছেন, ৫ জানুয়ারি তিনি ভোরবেলা
হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। সরবেড়িয়ার বাড়িতে থাকলে প্রতিদিনই প্রাতভ্রমণ করেন তিনি। ৫
জানুয়ারি তাই করেছিলেন। কিন্তু সেদিন ইডি বাড়িতে এসেছে শুনে এবং ইডির ফোন পেয়ে
শাহজাহান ভয় পান আর সেখান থেকে আর বাড়ি ফেরেননি বলে জানিয়েছেন সিবিআইকে।
সিবিআইয়ের হাতে মামলা যেতেই, বৃহস্পতিবার দিন ফের তারা সন্দেশখালিতে
শাহজাহানের বাড়িতে যান পর্যবেক্ষণ করতে। এরপর আজ শুক্রবার তালা খুলে শাহজাহানের
সন্দেশখালির বাড়িতে ঢোকে সিবিআই, সঙ্গে ইডির আধিকারিক এবং
ফরেন্সিক দলও ছিল। এদিন কেন্দ্রীয় বাহিনী সহ ৫০ জনের একটি দল শাহজাহানের বাড়িতে
তদন্ত করতে যায়। পাশাপাশি তারা স্থানীয় শাহজাহান মার্কেটে শাহজাহানের অফিসেও যান।
স্থানীয় সূত্রে খবর, এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করছে ফরেন্সিক
দল। এছাড়াও শাহজাহানের বাড়ির আশপাশ, যাওয়া আসার রাস্তা
সমস্তই করা হচ্ছে স্কেচ, নেওয়া হচ্ছে ছবিও। এদিন সিবিআইয়ের
দলে ছিলেন শাহজাহানের হাতে আক্রান্ত ইডিআধিকারিকরাই। সব দেখে বলাই বাহুল্য রাজ্য
পুলিশের হাতে থাকা সন্দেশখালির ‘বাঘ’ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে বেড়াল হয়েই
রয়েছেন।